ওয়াল স্ট্রিটে বাবলের আশঙ্কা

চীনের এআই খাতে ঝুঁকছেন বৈশ্বিক বিনিয়োগকারীরা

চলতি বছর ওয়াল স্ট্রিটে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) খাতের কোম্পানিগুলোর শেয়ারদরে রেকর্ড উল্লম্ফন ঘটেছে।

চলতি বছর ওয়াল স্ট্রিটে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) খাতের কোম্পানিগুলোর শেয়ারদরে রেকর্ড উল্লম্ফন ঘটেছে। যদিও বছরের শেষ দিকে এসে এসব কোম্পানির শেয়ারদরে অতিমূল্যায়নের আশঙ্কা বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ব্যাপক মাত্রায় ছড়িয়ে পড়েছে। তারা এখন বাজারে চলতি শতকের গোড়ার দিকে ঘটে যাওয়া ডটকম বাবলের পুনরাবৃত্তির ভয় পাচ্ছেন। অর্থনীতিবিদরাও বলছেন, বর্তমানে মার্কিন অর্থনীতিতে শেয়ারবাজারের প্রভাব বেশি। ফলে এআই খাতের শেয়ারদরে বড় ধরনের উল্লম্ফনসৃষ্ট বুদবুদ ফেটে গেলে বিশ্বের শীর্ষ অর্থনীতিতে আগের চেয়েও বেশি প্রভাব পড়ার জোর আশঙ্কা রয়েছে। এ অবস্থায় চীনের এআই খাতের প্রতি আকর্ষণ বাড়ছে বৈশ্বিক বিনিয়োগকারীদের। এতে বাজারে বিদ্যমান ঝুঁকির বৈচিত্র্যায়ন ও নিরাপদ বণ্টনের পাশাপাশি চীনা এআই প্রযুক্তির অগ্রগতির সুফলকেও কাজে লাগানো সম্ভব হবে বলে প্রত্যাশা তাদের।

এআই প্রযুক্তিতে স্বয়ম্ভরতা অর্জনে বেইজিংয়ের প্রয়াসও এখন বিনিয়োগকারীদের চীনা এআই কোম্পানির দিকে টেনে আনছে। এরই মধ্যে দেশটি অত্যন্ত দ্রুতগতিতে কয়েকটি চিপ নির্মাতা প্রতিষ্ঠানকে বড় অংকের আইপিওর অনুমোদন দিয়েছে। সর্বশেষ এর আওতায় চলতি মাসেই ‘চীনের এনভিডিয়া’ হিসেবে পরিচিত মুর থ্রেডস ও মেটাএক্স নামে দুটি কোম্পানি সাংহাইয়ে তালিকাভুক্ত হয়েছে।

বিদেশী বিনিয়োগকারীরা মনে করছেন, সরকারি প্রণোদনা ও সহায়তাকে কাজে লাগিয়ে চীনের এআই চিপ নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলো এখন বেশ দ্রুত বড় হয়ে উঠছে। এতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে প্রযুক্তিগত ব্যবধানও ক্রমেই কমিয়ে আনছে চীন। ফলে ওয়াল স্ট্রিটে এআই খাতের ওভারপারফরমিং শেয়ারে আরো অর্থ বিনিয়োগের চেয়ে চীনা কোম্পানিগুলোয় পুঁজি খাটানো নিরাপদ মনে করছে অনেক বিনিয়োগ ও সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান।

এমনই একটি কোম্পানি যুক্তরাজ্যভিত্তিক সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান রাফার। কোম্পানিটি সম্প্রতি জানিয়েছে, ইচ্ছাকৃতভাবেই কোম্পানিটি এখন ম্যাগনিফিসেন্ট সেভেন হিসেবে পরিচিত প্রতিষ্ঠানগুলোয় (অ্যাপল, অ্যামাজন, অ্যালফাবেট, মেটা, মাইক্রোসফট, এনভিডিয়া ও টেসলা) বিনিয়োগ সীমিত করে এনেছে। একই সঙ্গে এআই খাতের চীনা পোর্টফোলিওকে আরো সম্প্রসারণ করতে আলিবাবায় বিনিয়োগ বাড়ানোর কথা বাড়ছে রাফার।

রাফারের ইনভেস্টমেন্ট স্পেশালিস্ট জেমা কেয়ার্নস-স্মিথ বলেন, ‘ফ্রন্টিয়ার এআইয়ে যুক্তরাষ্ট্র এখনো এগিয়ে থাকলেও চীন খুব দ্রুত ব্যবধান কমাচ্ছে। যেভাবে ধারণা করা হয়, দুই দেশের এ ব্যবধান হয়তো ততোটা প্রশস্ত বা গভীর নয়। প্রতিযোগিতার চিত্রও এখন বদলে যাচ্ছে।’

চীনা জায়ান্ট আলিবাবার এআই চিপ ইউনিট আছে। নিজস্ব লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল ‘ক্যুয়েনের’ উন্নয়ন ঘটাচ্ছে কোম্পানিটি। পাশাপাশি ক্লাউড অবকাঠামোয় বড় অংকের বিনিয়োগও করছে।

সংশ্লিষ্টদের ভাষ্যমতে, চীনের মূল ভূখণ্ড ও হংকংয়ে একের পর এক এআই স্টার্টআপ এখন তালিকাভুক্ত হচ্ছে। একই সঙ্গে ডিপসিকের দ্রুত উত্থানও বৈশ্বিক বিনিয়োগকারীদের মনোযোগ আকর্ষণ করেছে। এতে বৈশ্বিক সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানিগুলোও এখন ক্রমেই চীনা এআই কোম্পানির দিকে মনোযোগী হয়ে উঠছে।

চলতি মাসেই ইউবিএস গ্লোবাল ওয়েলথ ম্যানেজমেন্টের এ-সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন প্রকাশ হয়। এতে চীনা প্রযুক্তি খাতকে বিনিয়োগের জন্য ‘সবচেয়ে আকর্ষণীয়’ হিসেবে মূল্যায়ন করা হয়।

প্রতিবেদনে বলা হয়, চীনের দৃঢ় নীতিগত সমর্থন, প্রযুক্তিগত স্বনির্ভরতা ও এআই থেকে দ্রুত আয় বাড়ার বিষয়টি বিনিয়োগকারীদের আকর্ষণ করছে।

বর্তমানে প্রযুক্তিনির্ভর নাসডাকের মূল্য-আয় অনুপাত (পিই রেশিও, যা শেয়ারপ্রতি দর ও আয় বা ইপিএসের অনুপাত) ৩১, যেখানে হংকংয়ের হ্যাং সেং টেক সূচকের অনুপাত ২৪। হ্যাংসেং টেকের মাধ্যমে আলিবাবা, বাইদু, টেনসেন্ট ও চিপ নির্মাতা এসএমআইসিসহ এআই-সংশ্লিষ্ট শেয়ারে বিনিয়োগের সুযোগ রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বিনিয়োগ কনসালট্যান্সি ফার্ম রেলিয়ান্ট সেপ্টেম্বরে নাসডাকে তালিকাভুক্ত একটি ফান্ড চালু করেছে, যা বিনিয়োগকারীদের ‘গুগল, মেটা, টেসলা, অ্যাপল ও ওপেনএআইয়ের চীনা সংস্করণে’ বিনিয়োগের সুযোগ দিচ্ছে।

চীনের আংশিক রাষ্ট্রায়ত্ত বহুজাতিক আর্থিক সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান চায়না ইন্টারন্যাশনাল ক্যাপিটাল করপোরেশনের (সিআইসিসি) একটি সাবসিডিয়ারি প্রতিষ্ঠান নিউইয়র্কভিত্তিক ক্রেনশেয়ার্স। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান বিনিয়োগ কর্মকর্তা (সিআইও) ব্রেন্ডন আহার্ন বলেন, ‘ক্যামব্রিকনের মতো চীনা এআই চিপ নির্মাতাদের দ্রুত উত্থান থেকে দেশটির এআই ও সেমিকন্ডাক্টর শিল্পে উদ্ভাবনের ব্যাপ্তি ও গতির ইঙ্গিত পাওয়া যায়।’

প্রযুক্তি খাতে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে স্নায়ুযুদ্ধ ক্রমেই তীব্রতর হওয়ার বিষয়টি চীনা কোম্পানিগুলোর পক্ষে যাচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘এ প্রতিযোগিতার বয়ান বা তাড়াহুড়ো, সবই চীনা কোম্পানিগুলোর পক্ষে যাচ্ছে।’

চীনের অফশোর তালিকাভুক্ত শেয়ার যেমন টেনসেন্ট, আলিবাবা ও বাইদুতে বিনিয়োগ করা ক্রেনশেয়ার্সের এক্সচেঞ্জ ট্রেডেড ফান্ড (ইটিএফ) কেডব্লিউইবির আকার চলতি বছর দুই-তৃতীয়াংশ বেড়ে প্রায় ৯ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। এছাড়া চীনের প্রযুক্তি খাতের অনশোর কোম্পানির শেয়ারে বিনিয়োগের উদ্দেশ্যে গড়ে তোলা ক্রেনশেয়ার্সের আরেকটি ইটিএফের আকারও এ বছর উল্লেখযোগ্য মাত্রায় বেড়েছে।

রেলিয়ান্ট গ্লোবাল অ্যাডভাইজার্সের প্রতিষ্ঠাতা জেসন সু বলেন, ‘এআই প্রতিযোগিতায় উদ্ভাবনে যুক্তরাষ্ট্র এগিয়ে থাকলেও প্রকৌশল, উৎপাদন ও বিদ্যুৎ সরবরাহে চীনের সুবিধা বেশি।’

তার প্রতিষ্ঠানটি চায়না অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানির সঙ্গে অংশীদারত্বে নাসডাকে তালিকাভুক্ত একটি ইটিএফ চালু করেছে, যা ক্যামব্রিকনসহ রূপান্তরমুখী প্রযুক্তিনির্ভর চীনা কোম্পানির শেয়ারে বিনিয়োগ করছে। জেসন সুর ভাষায়, ‘প্রযুক্তি খাতে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা চীনকে হার্ড টেকনোলজিতে বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগ ও শূন্য থেকে উদ্ভাবনে বাধ্য করেছে। বিনিয়োগকারীদের জন্য বিচক্ষণ কৌশল হলো বৈচিত্র্যায়নের মাধ্যমে এআই খাতের সুযোগগুলোকে কাজে লাগানোর পাশাপাশি অনিশ্চয়তা ও ঝুঁকির যথাযথ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা।’

এএমডির সাবেক নির্বাহীদের প্রতিষ্ঠিত চীনা এআই চিপ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান মেটাএক্স ইন্টিগ্রেটেড সার্কিটস গত সপ্তাহে সাংহাইয়ের বাজারে অভিষিক্ত হয়। অভিষেকেই কোম্পানির শেয়ারদর ৭০০ শতাংশ বেড়ে যায়। একইভাবে মেটাএক্সের প্রতিদ্বন্দ্বী মুর থ্রেডসের শেয়ারদর বাজার অভিষেকের ৪০০ শতাংশ বাড়ে।

যদিও কোনো কোনো ফান্ড ম্যানেজারের মতে, চীনে প্রযুক্তি খাতের সম্ভাবনা ও বিদেশী মূলধনের প্রবাহ এখনো সীমিত।

যুক্তরাজ্যভিত্তিক নর্থ অব সাউথ ক্যাপিটালের পার্টনার ও পোর্টফোলিও ম্যানেজার কামিল দিম্মিখ বলেন, ‘বর্তমানে তালিকাভুক্ত কোনো চিপ কোম্পানিরই মূল্যায়নের শক্ত ভিত্তি নেই। গোটা বাজারটিই একপ্রকার হুজুগে চলছে।’

আরও